Header Ads

নরসিংদী শিবপুরের বিখ্যাত মিষ্টি লাক্কার "রসগোল্লা "



 লাক্কাদা’র মিষ্টির দোকানটি রয়েছে নরসিংদী জেলা শিবপুর উপজেলা  বাজারের তরকারি পট্টিতে। নাম ‘লাক্কা ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। বর্তমানে এর স্বত্বাধিকারী লাক্কা ঘোষের ছেলে মনোরঞ্জন ঘোষ মন্টু। সেই জবরদস্ত ব্রিটিশ আমলে লাক্কাদা এ-দোকান কিনে নিয়েছিলেন অন্য একজন মিষ্টি বিক্রেতার কাছ থেকে। আর তখন থেকে এই দোকানের তাঁর হাতে তৈরি মিষ্টি দিনের পর দিন এলাকার মানুষকে পূর্ণ স্বাদ ও তৃপ্তি দিয়ে এসেছে।


বাঙালি আর মিষ্টি, এ-দুটিকে কোনোক্রমেই আলাদা করা যায় না। বাঙালির মিষ্টি না হলে যেনো চলতেই চায় না। কোনো শুভক্ষণে বা শুভদিনে অথবা বিশেষ কোনো  উপলক্ষে মিষ্টি, পালাপার্বণে মিষ্টি, কৃতিত্বপূর্ণ বিভিন্ন ফলাফলের জন্যে মিষ্টিমুখ না করলে আমাদের চলে না। নববধূর মুখদর্শনে হাড়িভর্তি মিষ্টি স্বতন্ত্র মাধুর্য আনয়ন করে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ জেলায়ই স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় কিছু মিষ্টি রয়েছে। আবার কোনো কোনো মিষ্টি স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য জেলায়, জেলা ছাড়িয়ে বাইরের দেশেও সুগন্ধ ছড়িয়েছে। এমনি একটি মিষ্টি নরসিংদী জেলার শিবপুরের প্রসিদ্ধ লাক্কা ঘোষের মিষ্টি বা লাক্কাদা’র মিষ্টি। আজকে না হয় কিছু কথা বলি লাক্কাদা’র মিষ্টি নিয়ে।

লাক্কাদা’র মিষ্টি নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে সুপ্রিয় পাঠক মহোদয়গণকে বাংলাদেশের নানা প্রান্তের হরেক রকম মিষ্টির খানিকটা সুঘ্রাণ পাইয়ে দেবার ইচ্ছে হলো। হয়তো কারো কারো জিহ্বায় পানি চলে আসতে পারে। তারজন্যে দুঃখ প্রকাশ করছি। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এক বা একাধিক মিষ্টির সুপরিচিতি রয়েছে। ক্রেতা সাধারণের নিকট কয়েকটি দোকানের মিষ্টির রয়েছে আলাদা কদর। ঢাকার মরণ চাঁদের মিষ্টি একসময় ছিলো মানুষের মুখে মুখে। কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই এবং রাজবাড়ি, পোড়াবাড়ি, কুষ্টিয়া ও টাঙ্গাইলের চমচম যথেষ্ট জনপ্রিয়। নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি, সাতক্ষীরা ও ন‌ওগাঁর সন্দেশ, যশোরের রসগোল্লা, খুলনার ইন্দ্রমোহন বিশেষ স্বাদের জন্যে বিখ্যাত। মুক্তাগাছার মণ্ডা, ভাগ্যকুল ও বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বিভিন্ন মিষ্টি, মুন্সিগঞ্জের অমৃতি, বগুড়ার নানা স্বাদের দই, নওগাঁর প্যারা ও বরিশালের গৌরনদীর দইয়ের রয়েছে আলাদা মজা। রাজশাহীর রসকদম, মেহেরপুরের রসকদম্ব, গাইবান্ধার রসমঞ্জুরী খেতে খেতে অনেকের মনেই হয়তো অজান্তে ভেসে ওঠে নজরুলের সেই বিখ্যাত সুরের মূর্ছনা— আমি পথ-মঞ্জুরী ফুটেছি আঁধার রাতে।/ গোপন অশ্রু-সম রাতের নয়ন-পাতে।।

নরসিংদী শহরের রমেশ, হরিবল, কানাই ও বাংলাদেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিষ্টিরও সুপরিচিতি আছে। বর্তমান সময়ে বনফুল, কাঁটাবন ও আলাউদ্দিনের মিষ্টিসহ অনেক মিষ্টি মানুষের প্রিয় মিষ্টিতে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমন আরো বহু সুস্বাদু মিষ্টি রয়েছে, যার বিবরণে গিয়ে কলেবর বৃদ্ধি করছি না। মিষ্টির ভালো-মন্দ দুই দিকই রয়েছে। বিপ্লবী ইংরেজ কবি রুডিয়ার্ড কিপলিং বলেছেন, “মিষ্টি যেমন সুস্বাদু, তেমনি ক্ষতিকর।”


ফিরে আসি লাক্কাদা’র কথায়। কালের সাক্ষী হয়ে লাক্কাদা’র মিষ্টির দোকানটি রয়েছে শিবপুর বাজারের তরকারি পট্টিতে। নাম ‘লাক্কা ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। বর্তমানে এর স্বত্বাধিকারী লাক্কা ঘোষের ছেলে মনোরঞ্জন ঘোষ মন্টু। সেই জবরদস্ত ব্রিটিশ আমলে লাক্কাদা এ-দোকান কিনে নিয়েছিলেন অন্য একজন মিষ্টি বিক্রেতার কাছ থেকে। আর তখন থেকে এই দোকানের তাঁর হাতে তৈরি মিষ্টি দিনের পর দিন এলাকার মানুষকে পূর্ণ স্বাদ ও তৃপ্তি দিয়ে এসেছে। লাক্কাদা’র পুরো নাম মনমোহন ঘোষ ওরফে লাক্কা। মনমোহন শব্দের অর্থ যেমন মন হরণকারী, তাঁর হাতের মিষ্টিও ঠিক তেমনি মজাদার ও তৃপ্তিকর। তাদের রক্ষিত রেকর্ড থেকে জানা যায়, লাক্কাদা’র জন্ম হয়েছিলো ১৮৯৫ সালে। তিনি প্রয়াত হন ২০০৭ সালে। এ-ধরাধামে ছিলেন প্রায় ১১২ বছর। লাক্কাদা’র বাবার নাম শ্রীচরণ ঘোষ। তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা আটারদিয়া (গ্রাম), চক্রধা (ডাকঘর), শিবপুর, নরসিংদী। মৃত্যুর সময় লাক্কাদা ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে রেখে যান। এক ছেলে তরণী মোহন ঘোষ শিক্ষকতা পেশায় সফলতা অর্জন করে অবসরে আছেন। বর্তমান স্বত্বাধিকারী মনোরঞ্জন ঘোষও শিক্ষকতার পাশাপাশি ডাক্তারি করতেন। কিন্তু তিনি পিতার সুনাম ও পেশাটি ধরে রাখার জন্যে অন্যসব কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। বাকি দুই ছেলে একসময় ভারতে চলে যান। মেয়েরাও ভালো অবস্থানে আছেন। লাক্কাদা’র ছেলেমেয়ে পৃথক হয়ে যাওয়ায় দোকানের আগের জৌলুস তেমন নেই বলে জানান তাঁর নাতি সুমন ঘোষ।

শুরু থেকেই লাক্কা ঘোষের মিষ্টি খুব‌ জনপ্রিয় ছিলো। এই মিষ্টির কারণে লাক্কাদা হয়ে ওঠেন এলাকার সবার কাছে সুপরিচিত। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যেনো হয়ে ওঠেছিলো তাঁর একান্ত বন্ধু। সে-সময় থেকে এখন অবধি লাক্কা ঘোষের মিষ্টি সবার পছন্দ। একসময় এই মিষ্টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাদৃত হয়েছিলো। কেউ কেউ পছন্দ করে বিদেশেও নিয়ে যেতো। তখন লাক্কা ঘোষের মিষ্টির জুড়ি ছিলো না। এখনো এই দোকানের মিষ্টি বেশ জনপ্রিয়। তবে বর্তমানে অনেক অনেক প্রসিদ্ধ মিষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে হয়। এখন বাজারে আরো অনেক ভালো ভালো মিষ্টি পাওয়া যায়। আমরা যখন ছোটো, সেই সময়ের শিবপুরের লাক্কা ও চরসিন্দুরের গোপালের মিষ্টির কথা খুব‌ই মনে পড়ে। নরসিংদীতেও ভালো মিষ্টি পাওয়া যেতো।

তখন বিভিন্ন অজুহাতে পেটচুক্তি মিষ্টি খাওয়ার একটি কথা খুব‌ই প্রচলিত ছিলো। পেট ভরে যতো ইচ্ছে ততো মিষ্টি খাওয়াই হলো পেটচুক্তি খাওয়া। বিভিন্ন জয়-পরাজয়ে বাজি ধরে তখন পেটচুক্তি মিষ্টি খেয়ে অনেক আনন্দ করা হতো। তৎসময়ে এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণে মিষ্টি ছিলো না বলে এমন দুয়েকটি দোকান জনপ্রিয় ছিলো। শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজসহ এলাকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে লাক্কা ঘোষের মিষ্টি সরবরাহ হতো। শহীদ আসাদ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মরহুম নূরুল ইসলাম খান লাক্কাদা’র মিষ্টি খুব‌ই পছন্দ করতেন। তিনি অনেককে স্লিপ দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন লাক্কাদা’র দোকানে মিষ্টি খাওয়ার জন্যে। বিল অনেক বড়ো হলে লাক্কাদা কলেজে এসে টাকা নিয়ে যেতেন।

ভারতবর্ষে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মিষ্টি তৈরি হয় বলে জানা যায়। বর্তমানের অনেক বিখ্যাত মিষ্টির বয়স খুব বেশি নয়। একসময় এদেশে হিন্দুরাই বেশি মিষ্টি বানাতো। অনেকের মতে, ননি ও মাখন জাতীয় খাবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের খুব‌ই প্রিয় ছিলো। সেজন্যে মিষ্টি তৈরি পুণ্যেরও কাজ। রসগোল্লার পুরাতন নাম ছিলো ‘গোপাল গোল্লা’। ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে মিষ্টির যথেষ্ট সমাদর নেই বলেই জানা যায়।


চিনি বা গুড়ের সাথে ভেজানো ময়দার গোলা কিংবা চিনি-দুধ মিশিয়ে তৈরি খাবারকেই মিষ্টি বলে। মিষ্টি তৈরি এখন একটি বিশেষ আধুনিক কলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা মিষ্টি তৈরি করে, তাদের বলা হয় ময়রা বা মিষ্টির কারিগর। এলাকাভিত্তিক মিষ্টির জন্যে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। অতীতে সুনাম অর্জনকারী এমনি একজন হচ্ছেন প্রয়াত লাক্কাদা। তাঁর কথা শিবপুরের মানুষের মনে থাকবে অনেকদিন। লাক্কাদা আজ নেই, চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু এখনো যারা লাক্কাদা’র প্রতিষ্ঠিত ‘লাক্কা ঘোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এ মিষ্টি খেতে আসেন, তারা তাঁকে নিয়ে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন, মিষ্টির স্ট্যান্ডের উপরে রক্ষিত তাঁর ছবিটি দেখে হারিয়ে যান পেছনের দিনগুলোতে।


লিখেছেন :- নূরুদ্দীন দরজী সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার।

No comments

কপিরাইট @সময় নিউজ ২৪ -২০১৮ এই সাইটের কোন সংবাদ ও ছবি কপিরাইট করা সম্পূর্ণ বেআইনি . Powered by Blogger.